ইংরেজদের দেওয়ানি লাভ

 


১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল এটি ছিল তারই অন্যতম পরিনতি। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা কে পরাজিত করে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ বুঝেছিলেন যে এদেশের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখল করা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। তবে সুচতুর ও দূরদৃষ্টির অধিকারী ক্লাইভ বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের তুলনায় অর্থনৈতিক ক্ষমতা দখলই যে অধিক লাভজনক বুঝেছিলেন। তাই বাংলার নবাব কে পুতুলে পরিণত করে কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। 

নজম-উদ-দৌল্লার সঙ্গে সন্ধি :

বক্সারের যুদ্ধের পর কলকাতা কোম্পানির কর্তৃপক্ষ বৃদ্ধ মীরজাফরকে দ্বিতীয়বারের জন্য নবাব মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে তিনি মারা গেলে কোম্পানি এক চুক্তির দ্বারা তার পুত্র নজম-উদ-দৌলা কে মসনদে বাসায়। এই চুক্তি অনুসারে : (ক) নবাব তাঁর সেনাদল ভেঙে দেন। (খ) কোম্পানির দ্বারা নিযুক্ত নায়েব দেওয়ান বাংলার নিজামতি বা শাসন নবাবের তরফে চালাবার দ্বায়িত্ব পান। (গ) কোম্পানির অনুমতি ছাড়া এই নায়েবকে সরানোর অধিকার হারান নবাব। (ঘ) নজম-উদ-দৌল্লা কলকাতা কাউন্সিলকে ১৫ লক্ষ টাকা উপঢৌকন দেন। 

ক্লাইভের চিন্তাভাবনা :

ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ বক্সারের যুদ্ধের পর রবার্ট ক্লাইভকে দ্বিতীয়বারের জন্য গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত করে ভারতে পাঠান। অত্যন্ত দক্ষতার ও চতুরতার সাথে বক্সার যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তিনি আবার প্রমাণ করলেন কতখানি তিনি বুদ্ধিমান। ক্লাইভ ইচ্ছা করলে বাংলা অযোধ্যা বা দিল্লির ওপর পরিপূর্ণভাবে ইংরেজ কর্তিত্ব কায়েম করতে পারতেন কিন্তু পরিস্থিতি বিচার করে তিনি তা করলেন না। প্রথমত, ক্লাইভ সেই মুহূর্তে প্রত্যক্ষভাবে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে রাজি ছিলেন না। কারণ তখন অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি ভারতে বানিজ্য চালাচ্ছিল। ইংরেজগণ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করলে অন্যান্য ইউরোপীয়গন মিলিতভাবে ইংরেজের বিরোধিতা করতে পারত। দ্বিতীয়ত, তখন প্রধানত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাতেই কোম্পানির প্রভাব-প্রতিপত্তি সীমাবদ্ধ ছিল। দূরবর্তী প্রদেশসমূহ দখল করলেও সেখানে কর্তৃত্ব বজায় রাখা সহজসাধ্য হতো না। তৃতীয়ত, বক্সারের যুদ্ধের ফলে কোম্পানি যে সকল অধিকার লাভ করেছিল তাদের কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না। তাই ক্লাইভ স্থান দখল এর পরিবর্তে আইনগত প্রতিষ্ঠার প্রতি অধিক আগ্রহী ছিলেন। 

এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি :

উপরিল্লিখিত বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাইভ দ্বিতীয়বারের জন্য ভারতে এসেই পরাজিত শাসকদলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে উদ্যোগী হন। তাই কোম্পানি অযোধ্যার নবাব এর সাথে অযোধ্যার প্রথম সন্ধি স্বাক্ষর করে। এই সন্ধি অনুসারে -(১) নবাব সুজাউদ্দৌলা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ কোম্পানিকে ৫০ লক্ষ টাকা এবং কারা, এলাহাবাদ নামক দুটি প্রদেশ প্রদান করতে স্বীকৃত হন। (২) কোম্পানি অযোধ্যার নবাবকে বৈদেশিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করার দ্বায়িত্ব নেয়। 

এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি ও দেওয়ানি লাভ :

অতঃপর ক্লাইভ ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১২আগষ্ট মুঘল সম্রাট শাহ আলমের সাথে কোম্পানির এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি স্বাক্ষরিত করেন। এই সন্ধির শর্ত অনুসারে - (১) কোম্পানি সম্রাটকে কারা ও এলাহাবাদ প্রদেশ দুটি ছেড়ে দেওয়া হয়। (২) সম্রাট বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কোম্পানিকে ছেড়ে দেন। (৩) রাজস্ব আদায়ের বিনিময়ে কোম্পানি সম্রাটকে বাৎসরিক ২৬ লক্ষ টাকা নজরানা দিতে অঙ্গীকার করে। (৪) কোম্পানি বাংলার নবাব নজম-উদ-দৌল্লাকে নিজামতি খরচার জন্য বাৎসরিক ৫৩ লক্ষ টাকা দিতে রাজি হয়। 

কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফল :

কোম্পানী কর্তৃক বাংলার দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫খ্রীঃ) ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। 

প্রথমত, এতকাল পর্যন্ত এদেশে কোম্পানির কোন আইনগত স্বীকৃতি ছিলনা। পলাশীর যুদ্ধ থেকে পরবর্তীকালে যে ক্ষমতা তাদের হস্তগত হয়েছিল তা নিছক শক্তির ফল। কিন্তু দেওয়ানি সনদ লাভ করার ফলে এদেশের প্রশাসনে কোম্পানির ক্ষমতা আইনগতভাবে স্বীকৃত হলো। কোম্পানি একটি নিছক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো। দেওয়ানি দখলের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় ভারত ইতিহাসের এক নবতম অধ্যায়। বস্তুত কোম্পানির হাতে দেওয়ানির ভার অর্পিত হওয়ার ফলে আর্থিক এবং রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে বাংলার নবাবের গুরুত্ব ভীষণভাবে হ্রাস পেয়েছিল। নবাব অতঃপর সবক্ষেত্রেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন কোম্পানি নিযুক্ত নতুন দেওয়ানের উপর। 

দ্বিতীয়ত, পলাশীর বিপর্যয়ের পর বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনের যে ধারা শুরু হয়েছিল দেওয়ানি লাভ করার ফলে তা আরো ব্যাপকতা পায়। দেওয়ানী আদায়ের নামে কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা উদ্বৃত্ত অর্থ এবং বিনাশুল্কে বাণিজ্য করে সঞ্চয় করা অপরিমেয় মুনাফা চালান হয়ে যায় সুদূর ইংল্যান্ডে। ভারতীয় সম্পদ হয়ে ওঠে ইংল্যান্ডের ধন-ভান্ডার। ঐতিহাসিকদের অনুমান এই অপরিমেয় সম্পদ ও কাঁচামালের নিশ্চয়তা ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল। 

তৃতীয়ত, কোম্পানির দেওয়ানি লাভ করার পর বাংলায় শুরু হয়েছিল দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার। নবাবের হাতে নিজামত এবং কোম্পানির হাতে ছিল দেওয়ানী। অর্থ ও সামরিক শক্তি কোম্পানির হাতে থাকার ফলে নবাব ছিলেন তাদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেওয়ানি প্রশাসন সম্পর্কে কোম্পানির কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা এ দায় চাপিয়ে ছিল নবাবের কর্মচারীদের ওপর। দেওয়ান নবাবের কর্মচারী হলেও এরা ছিলেন ইংরেজদের বশীভূত। ফলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শুরু হয়েছিল এক অভূতপূর্ব অরাজক অবস্থা। অথচ দেওয়ানি লাভ করলেও কোম্পানি নিজে হাতে দেওয়ানী বা রাজস্ব আদায়ের কাজ না রেখে তা নবাবের কর্মচারীদের হাতে রেখে দেন। কিন্তু আদায়কৃত রাজস্বের মালিকানা থাকে কোম্পানির হাতে। ফলের নবাব পান ক্ষমতাহীন দায়িত্ব আর কোম্পানি পায় দায়িত্বহীন ক্ষমতা। এভাবে শুরু হয় দ্বৈত শাসন জনিত বিভ্রান্তি।

 চতুর্থত, কোম্পানির নিযুক্ত দেওয়ান রেজা খাঁ, সিতাব রায় প্রমুখ অত্যাচার চালিয়ে যত বেশি সম্ভব রাজস্ব আদায় শুরু করেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অনাবৃষ্টি। বাংলার বুকে নেমে আসে অভূতপূর্ব ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। খাদ্যাভাবে ও রোগে মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। শ্মশানে পরিণত হয় বাংলার গ্রাম্য জীবন। এই সময় কৃষিকাজের যে ক্ষতি হয়েছিল তা পরবর্তী বিশ বছরের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব হয় নি। 

পঞ্চমত, দ্বৈত শাসনের এই মারাত্মক পরিনতি কোম্পানির ডিরেক্টরদের চোখ খুলে দেয়। কোম্পানি বাংলার শাসনভার সরাসরি গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ওয়ারেন হেস্টিংসকে বাংলার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করে কোম্পানি নবাবের হাত থেকে দেশের প্রকৃত শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেয়। ফলে শুরু হয় ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate