মুঘল সাম্রাজ্য

মোঙ্গ শব্দ থেকে মোঙ্গল শব্দটি এসেছে। যার অর্থ নির্ভিক। আবার মোঙ্গল শব্দ থেকে মোগল বা মুঘল শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। মোঙ্গলিয়ার যুদ্ধপ্রিয় জাতির বংশধর হল মুঘলেরা। 
বাবর :
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর খাঁটি মোঙ্গল ছিলেন না। মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খাঁ ও তুর্কি নেতা তৈমুর লঙ্গ এই দুই বীরের বংশের মিলিত রক্ত ছিল বাবরের শরীরে। ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে বাবরের জন্ম হয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল ওমর শেখ মির্জা, যিনি রুশ-তুর্কি স্থানের অন্তর্গত ফারগানা রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর বাবর আত্মীয় স্বজনদের দ্বারা পিতৃরাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। দেশ দেশান্তর ঘুরে ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে সামান্য কিছু অনুচরদের সঙ্গে নিয়ে কাবুল দখল করেন। এরপর তিনি ভারত জয়ের পরিকল্পনা করেন। লোদি বংশের শেষ সম্রাট ইব্রাহিম লোদির অযোগ্যতার কারণে অভিজাতরা তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হন। ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে দিল্লির আমীররা ষড়যন্ত্র করেন। পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ-এর আমন্ত্রণে বাবর ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবে প্রবেশ করেন এবং লাহোর অধিকার করেন। কিন্তু বাবরের রাজত্ব বিস্তারের নীতি দৌলত খাঁ লোদির এবং আলম খাঁ-এর মনঃপূত না হওয়ায় তাঁরা বাবরের বিরোধিতা করেন। বাবর এক আমীরকে লাহোরের শাসনভার দিয়ে নিজে কাবুলে চলে যান। এদিকে বাবরের অনুপস্থিতিতে দৌলত খাঁ ও আলম খাঁ লাহোরের শাসনকর্তাকে বিতাড়িত করে লাহোর অধিকার করেন। দুবছর পর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবর দিল্লির অভিমুখে যাত্রা করেন। ইব্রাহিম লোদি বাবরের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে পানিপতের উপস্থিত হন। কিন্তু বাবরের বারুদ ও কামানের কাছে ইব্রাহিম লোদি সহজেই পরাজিত ও নিহত হন। এইভাবে প্রথম পানিপতের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে বাবর ভারতে প্রথম মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুত বীর সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করে রাজপুত আক্রমণের সম্ভাবনা দূর করেন। ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে ঘর্ঘরার যুদ্ধে জৌনপুরের অধিপতি মামুদ লোদি, বিহারের আফগান নেতা শের খাঁ ও বাংলার সুলতান নসরৎ শাহের মিলিত শক্তিকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে আফগান শক্তির উত্থান সম্ভাবনার অবসান ঘটে, নসরৎ শাহ পরাস্ত হয়ে বাবরের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন এবং বাবরের সাম্রাজ্যের সীমানা পূর্বে বিহার পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। পর পর কয়েকটি যুদ্ধে জয়লাভ করে বাবর এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। 
হুমায়ুন:
বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হুমায়ুন ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে বিল্বগ্রামের বা কনৌজের যুদ্ধে শেরশাহের কাছে পরাজিত হন এবং রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। রাজ্যচ্যুত থাকাকালীন ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু দেশের অমরকোট নামক স্থানে হুমায়ুনের পুত্র তথা মুঘল সাম্রাজ্যের পরবর্তী শাসক আকবরের জন্ম হয়। পরবর্তীতে শেরশাহের মৃত্যুর পর শূর রাজপরিবারের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে হুমায়ুন রাজ্য পুনরুদ্ধারে প্রয়াসী হন। পারস্য রাজা শাহ তহমাস্পের সহায়তায় হুমায়ুন কিছু সৈন্য সংগ্রহ করে কাবুল, কান্দাহার, লাহোর ও দিল্লি অধিকার করেন। এইভাবে ভারতে আবার মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ় হয়। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে। 
আকবর :
হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আকবর মাত্র ১৪ বছর বয়সে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। হুমায়ুনের বিশ্বস্ত অনুচর ও বন্ধু বৈরাম খাঁ আকবরের অভিভাবক নিযুক্ত হন। তিনি অল্প বয়সী আকবরকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করেন, যদিও প্রকৃতপক্ষে ভারতের সার্বভৌম প্রভুত্ব লাভ করতে আকবরের অনেক সময় লেগেছিল। শূর বংশীয় সুলতান মহম্মদ শাহ আদিল দিল্লির সিংহাসন দখল করার অভিপ্রায়ে তাঁর মন্ত্রী হিমুকে দিল্লির অভিযানে পাঠান। হিমু দিল্লি অধিকার করে বিক্রমজিৎ উপাধি ধারণ করেন। তবে পানিপতের প্রান্তরে আকবর ও বৈরাম খাঁ হিমুকে বাধা দেন। ফলে সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ বাধে যা পানিপতের দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে হিমু পরাজিত হলে আফগান শক্তি ধ্বংস হয়। এরপর একে একে উত্তর ভারতের গোয়ালিয়র, আজমির, জৌনপুর, মালব, গণ্ডোয়ানা, রণথম্বোর, কলিঞ্জোর, বিকানীর, জয়শলমীর ও চিতোর রাজ্য জয় করেন। কিন্তু মেবারের রাণা প্রতাপসিংহ আকবরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১৮ ই জুন হলদিঘাটের যুদ্ধ হয়। অসীম বীরত্বের সঙ্গে রাজপুতরা লড়াই করলেও প্রতাপসিংহ আকবরের কাছে পরাজিত হন। তবুও তিনি আকবরের সঙ্গে সন্ধি করেননি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জঙ্গলে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকেই তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতাপসিংহ চিতোর ও আজমীর ছাড়া মেবারের অধিকাংশ অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেন। এরপর আকবর গুজরাট, বাংলা, কাশ্মীর, সিন্ধু, উড়িষ্যা, বেলুচিস্তান এবং দক্ষিণ ভারতের আহম্মদ নগর, খান্দেশ প্রভৃতি রাজ্য জয় করে এক বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। 
আকবরের ধর্মমত ছিল উদার। তাঁর এই উদার ধর্মমতের মূলে ছিল রাজপুত মহিষীদের প্রভাব, সুফি সম্প্রদায়ের প্রভাব এবং নিকট মিত্র ফৈজী ও আবুল ফজলের প্রভাব। সব ধর্মের কথা জানার জন্য তিনি ফতেপুর সিক্রীতে একটি ইবাদৎখানা নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি হিন্দু, জৈন, খ্রিষ্টান, পার্শী প্রভৃতি ধর্মের ধর্মগুরুদের আমন্ত্রণ করে ধর্মের আলোচনা শুনতেন। সমস্ত ধর্মের আলোচনা শুনে তিনি উপলব্ধি করেন, সব ধর্মের মর্মকথা এক। তিনি সকল ধর্মের লোকদের মিলিত করার জন্য ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে দীন-ই-ইলাহী নামে এক নতুন একেশ্বরবাদী ধর্মমতের প্রবর্তন করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দীন-ই-ইলাহী ছিল সব ধর্মের সার-সংকলন মাত্র। আকবরের এই ধর্মমত প্রচারের একমাত্র আদর্শ ছিল 'সুলহে-কুল' বা পরধর্ম সহিষ্ণুতা। আকবর শিক্ষা, শিল্প ও সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। আকবরের রাজসভায় নবরত্ন স্থান পেয়েছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আইন-ই-আকবরী ও আকবরনামা গ্রন্থের রচয়িতা আবুল ফজল, প্রখ্যাত কবি ফৈজী, বিদূষক বীরবল, রাজস্ব সচিব টোডরমল, বিশিষ্ট কর্মচারী হাকিম হুকুম, মোল্লা দো-পেয়াজা, মিরাত-উল-কায়নাত গ্রন্থের রচয়িতা ঘিজালি, ওয়াকিয়াত-ই-বাবর গ্রন্থের রচয়িতা রহিম-খান-খানন, সঙ্গীত বিশারদ মিয়া তানসেন এবং প্রধান সেনাপতি রাজপুতবীর মানসিংহ। আকবরের আমলে চিত্র শিল্প উৎকর্ষতা লাভ করে। এদের মধ্যে নল-দময়ন্তী, কালিয়-দমন, জাফর-নামা প্রভৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য। আগ্রা ও ফতেপুর সিক্রীতে নির্মিত প্রাসাদগুলিতে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্য রীতির মিশ্রণ দেখা যায়। 
আকবর এক উন্নত ও মানবতাবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রচলন করেন। শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন সম্রাট। প্রজাদের কল্যাণই ছিল আকবরের শাসনব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য। আকবর ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে টোডরমলকে দিয়ে সমস্ত অঞ্চল জরিপ করিয়ে রাজস্ব নির্দিষ্ট করে রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যপক পরিবর্তন আনেন। আকবরের শাসনব্যবস্থারয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল মনসবদারী প্রথা। এই প্রথার বৈশিষ্ট্য হল বেতন অনুসারে কর্মচারীদের পদমর্যাদা স্থির করা। সুশাসন জনপ্রিয়তার কারণে আকবরকে শ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাট বলা হয়। 
১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে রোগাক্রান্ত হয়ে আকস্মিকভাবে আকবরের মৃত্যু ঘটে। 
জাহাঙ্গীর :
আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সেলিম 'নূরউদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী' নাম নিয়ে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসেই তিনি রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি প্রথম মেবার জয়ের পরিকল্পনা করেন। মেবারের শাসক রানা প্রতাপসিংহের পুত্র অমরসিংহ মুঘলদের বশ্যতা অস্বীকার করেন। অতঃপর জাহাঙ্গীর তিনবার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান করেন এবং শেষ পর্যন্ত অমরসিংহ মুঘলদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। এই সময় বাংলাদেশে বারভূঁইয়া নামে পরিচিত হিন্দু ও মুসলমানরা সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বারভূঁইয়াদের পরাজিত করেন এবং বাংলাদেশে মুঘলদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপরে জাহাঙ্গীর দক্ষিণ ভারতে অভিযান শুরু করেন। আহম্মদ নগরের মালিক অম্বরকে দমন করার জন্য জাহাঙ্গীর তাঁর পুত্র খুররমকে অভিযানে পাঠান। মালিক অম্বরকে পরাজিত করলে জাহাঙ্গীর খুররমকে শাহজাহান উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি বিজাপুর ও গোলকুন্ডা দখল করেন। এছাড়া উত্তর পশ্চিম সীমান্তের কান্দাহার পুনরুদ্ধার করেন। তিনি মেহেরউন্নিসা নামে এক পরমাসুন্দরী নারীকে বিবাহ করেন এবং পরে তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন নুরজাহান বা জগতের আলো। এই মহিলাই জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের শেষ পর্বে প্রকৃত শাসনকর্ত্রী ছিলেন। জাহাঙ্গীর একাধারে নিষ্ঠুর ও স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তিনি সর্বদা বিলাস-ব্যসনে মত্ত থাকতেন। জাহাঙ্গীর শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্টপোষক ছিলেন। তাঁর আমলে রচিত কিছু গ্রন্থ হল মাসির-ই-জাহাঙ্গীরী, ইকবাল-নামা-ই-জাহাঙ্গীরী ইত্যাদি। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী নামক আত্মচরিত গ্রন্থটিও উৎকৃষ্ট ছিল। তাঁর আমলে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ছিলেন ফারুক বেগ ও মহম্মদ মুরাদ। তাঁর আমলে নির্মিত কিছু স্মৃতিসৌধ হল সেকেন্দ্রায় অবস্থিত আকবরের সমাধি, এছাড়া নূরজাহান তাঁর পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করেন ইতমাদ-উদ-দৌল্লা। ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর মারা যান। 
শাহজাহান :
সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তাঁর তৃতীয় পুত্র খুররম শাহজাহান নাম নিয়ে মুঘল সিংহাসনে বসেন (১৬২৭ খ্রীঃ)। তিনি ছিলেন জাহাঙ্গীরের রাজপুত মহিষী জগৎ গোসাই-এর গর্ভজাত সন্তান। জাহাঙ্গীরের প্রিয় সন্তান ছিলেন শাহজাহান। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে নূরজাহানের ভ্রাতা আসফ খাঁর কন্যা মমতাজের সঙ্গে শাহজাহানের বিবাহ হয়। সিংহাসনের সম্ভাব্য সমস্ত উত্তরাধিকারীদের হত্যা করে নিজের সিংহাসন সুনিশ্চিত করেন। শাসনকার্য পরিচালনা বা সাম্রাজ্য বিস্তারে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। এই সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বৈদেশিক বাণিজ্যের উন্নতি ঘটেছিল। তাঁর রাজত্বকালে স্থাপত্যশিল্প, সংগীত ও চিত্রশিল্পর অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছিল। আগ্রার মতি মসজিদ, দিল্লির জুম্মা মসজিদ, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস স্থাপত্য শিল্পের উজ্জ্বল নিদর্শন। এছাড়া মনি-মানিক্য খচিত ময়ূর সিংহাসন ও আগ্রার তাজমহল শাহজাহানের অমর কীর্তি ও বিশ্বের বিস্ময়। শাহজাহানের শেষ জীবন বহু কষ্টের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়। পুত্র ঔরঙ্গজেব তাঁকে কারারুদ্ধ করেন। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু ঘটে। 
ঔরঙ্গজেব:
শাহজাহানের জীবিত অবস্থায় মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর চার পুত্র দারা, সুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদ শেষপর্যন্ত গৃহযুদ্ধের রূপ ধারণ করে। শাহজাহান যখন অসুস্থ ছিলেন তখন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশিকো পিতার কাছে ছিলেন। শাহজাহান দারাকেই পরবর্তী মুঘল সম্রাট করার জন্য মনস্থির করেন। এদিকে পিতার অসুস্থতার খবর পেয়ে সুজা বাংলায় নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। আবার মুরাদ নিজেকে গুজরাটের সম্রাট ঘোষণা করেন। সুজা সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রার অভিমুখে রওনা হলে ঔরঙ্গজেব মুরাদের সঙ্গে এক চুক্তি করেন। এই চুক্তি অনুসারে তাঁরা উভয়েই সুজা ও দারার সঙ্গে যুদ্ধ করে সমস্ত রাজ্য অধিকার করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধে সুজা পরাজিত হয় এবং বাংলায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। ঔরঙ্গজেব ধর্মাটের যুদ্ধে দারার সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেন। এরপর ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ আগ্রার নিকটবর্তী সামুগড়ে উপস্থিত হলে দারা সেনাবাহিনী নিয়ে ঔরঙ্গজেব ও মুরাদের বাহিনীকে বাধা দেন। কিন্তু সেখানে দারা পরাজিত হন। ঔরঙ্গজেব আগ্রার সিংহাসন দখল করেন এবং পিতা শাহজাহানকে কারারুদ্ধ করেন। দারা পাঞ্জাবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদিকে ঔরঙ্গজেব মুরাদকে কারারুদ্ধ করে হত্যা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই দারাকেও কারারুদ্ধ করেন এবং পরে তাঁকে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে হত্যা করেন। অপরদিকে বাংলায় সুজা ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার কাছে পরাজিত হন এবং আরাকান রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু সেখানে পরিবারসহ আরাকান রাজার হাতে নিহত হন। এইভাবে বৃদ্ধ পিতাকে কারারুদ্ধ করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী তিন ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঔরঙ্গজেব 'আলমগীর পাদশাহগাজী' নাম নিয়ে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তিনি প্রায় ৫৩ বছর রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন গোঁড়া মুসলমান এবং অপর ধর্মের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন। হিন্দুদের ওপর তিনি জোর করে জিজিয়া কর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সন্দেহপ্রবণ এবং তাঁর অদূরদর্শী ধর্ম নীতির কারণে সারাজীবন তিনি অশান্তির মধ্যে কাটিয়েছিলেন। তাঁর ত্রুটিপূর্ণ শাসননীতির ফলস্বরূপ ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন সুনিশ্চিত হয়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate