হুসেন শাহী বংশ

 হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠা :

১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে এক হাবসী ক্রীতদাস বাংলায় ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান জালালুদ্দিন ফতে শাহকে হত্যা করে বাংলায় সিংহাসন দখল করেন। ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বাউল হাবসী শাসন চলে। এই সময়কালকে বাংলার ইতিহাসে অন্ধকার যুগ বলা হয়। হাবসীদের শেষ সুলতান মুজাফফর শাহের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সেই সুযোগে মুজাফফর শাহের উজীর হুসেন শাহ বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেন। বিদ্রোহীদের হাতে মুজাফফর এর মৃত্যু হলে বাংলার আমির-ওমরাহ ওদের অনুরোধে হোসেন শাহ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নাম ধারণ করে ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। এইভাবে বাংলায় হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। 

আলাউদ্দিন হুসেন শাহ :

আলাউদ্দিন হুসেন শাহের জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ঐতিহাসিকদের মতে তিনি আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল সৈয়দ আসরফ। শৈশবে তিনি পিতার সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত একানি-চাঁদপাড়া নামে একটি গ্রামে বাস করতেন। তিনি হাবসীদের শাসনকালে উজীর পদে উন্নীত হন। হুসেন শাহের সুদীর্ঘ ২৬ বছরের রাজত্বকাল (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রীঃ) বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমন :

সিংহাসনে আরোহণ করে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমনে উদ্যোগী হন। এজন্য তিনি বহু হাবসী আমীর ও কর্মচারীকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করেন। নতুন এক শ্রেণীর কর্মচারী নিযুক্ত করে তিনি রাজ্যের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দমন করেন। হুসেন শাহের রাজত্বকালে উত্তর প্রদেশের জৌনপুরের শর্কীদের সঙ্গে দিল্লির সুলতান সিকন্দর লোদীর সংঘর্ষ বাধে। শর্কীর সুলতান পরাস্ত হয়ে বাংলার সুলতান হুসেন শাহের আশ্রয় লাভ করেন। হোসেন শর্কীকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে দিল্লির বাহিনী বাংলার বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির দ্বারা বাংলার সুলতান হুসেন শাহ দিল্লির সুলতান সিকন্দর লোদীকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি সিকন্দরের শত্রুদের সহায়তা করবেন না। এর ফলে বাংলার উত্তর পশ্চিম সীমান্ত নিরাপদ হয়। 

রাজ্য বিস্তার :

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সমস্যা সমাধান করে হুসেন শাহ রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হন। রিয়াজ ও বুকাসনের বিবরণ থেকে জানা যায় ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান বাংলার উত্তর পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত কামতাপুর (কোচবিহার) এবং কামরূপের কিছু অংশ দখল করে নেন। এরপর সুলতান অহোম বা আসাম রাজ্য আক্রমণ করেন কিন্তু তা জয় করতে ব্যর্থ হন। বর্ষার প্রকোপে এবং অহমীয় সেনাপতি গোহাইনের বাধায় তাঁর আসাম জয়ের চেষ্টা বিফল হয়। হোসেনসহ তার রাজত্বের শেষদিকে ত্রিপুরা আক্রমণ করেন। তিনি ত্রিপুরা জয়ের জন্য চারটি অভিযান পাঠান। তাঁর সেনাপতি গোরাই মল্লিক ও হতে খান ত্রিপুরার রাজা ধনমানিক্যের কাছে পরাজিত হন। কবীন্দ্র পরমেশ্বরের রচনা থেকে জানা যায় যে, হুসেন শাহ নিজে শেষ অভিযান পরিচালনা করে কৈলাগড়ের যুদ্ধে ধনমানিক্যেকে পরাজিত করে ত্রিপুরার বৃহৎ অংশ অধিকার করেন।আরাকানের রাজা চট্টগ্রাম অধিকারের চেষ্টা করলে তিনি সেনাপতি পরাগল খান ও ছুটি খানের দ্বারা চট্টগ্রাম রক্ষা করেন। হুসেন শাহ বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তে উড়িষ্যায় রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হন। তবে প্রতাপরুদ্র উড়িষ্যা থেকে সুলতানের সেনাবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। বিহারের মুঙ্গের, পাটনা প্রভৃতি জেলায় প্রাপ্ত হুসেন শাহের বিভিন্ন শিলালিপি থেকে অনুমিত হয়, ঐসব অঞ্চলে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন হুসেন শাহের মৃত্যু হয়। 

আলাউদ্দিন হুসেন শাহের অবদান :

আলাউদ্দিন ছিলেন উদার, ধর্মসহিষ্ণু ও প্রজাহিতৈষী শাসক। কর্মচারী নিয়োগে হুসেনসহ যোগ্যতাকে মূল্য দিতেন - ধর্মকে নয়। রূপ ও সনাতন নামে দুই ভাই যথাক্রমে হুসেন শাহের রাজস্ব সচিব ও ব্যক্তিগত সচিব পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন।এছাড়া তাঁর উজীর ছিলেন গোপীনাথ বসু, সেনাপতি ছিলেন গৌরব মল্লিক প্রমূখ। এইভাবে হিন্দু গণকে উচ্চ পদে নিয়োগ করে তিনি হিন্দু প্রজাবর্গের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি চৈতন্যদেবের গুণগ্রাহী ছিলেন। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। যশোরাজ খান, দামোদর, বিপ্রদাস পিপিলাই, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী প্রমুখ কবিরা তাঁর সমাদর পান। তাঁর আমলে ছোট সোনা মসজিদ ও গুমতি দরওয়াজা নির্মিত হয়। 



নসরৎ শাহ :

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নসরৎ শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বকালে প্রথমার্ধ মোটামুটি শান্তিতে ঘটেছিল। ওই সময়ে তিনি শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রত্যক্ষ উৎসাহে ও সাহায্যে বাংলায় বিশেষত পান্ডুয়া ও গৌড়ে একাধিক সুন্দর স্থাপত্যকর্ম নির্মিত হয়েছিল। তাঁর রাজত্বকালের দ্বিতীয়ার্ধে বারবার সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার সমস্যা তাকে বিব্রত করে তোলে। বাবর এর নেতৃত্বে মোঘলরা পূর্ব ভারতের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল। বাংলার নিরাপত্তার জন্য নসরৎ শাহ উদ্যোগী হন। তিনি উত্তর ভারত থেকে বিতাড়িত আফগান জনগোষ্ঠী, জৌনপুরের লোহানী বংশীয় সুলতান বাহার খাঁ লোহানী ও বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ প্রমুখকে সঙ্ঘবদ্ধ করে মুঘল বিরোধী সংঘ গড়ে তোলেন। বাবর বক্সার পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে নসরৎ শাহের কাছে এক দুত পাঠান ও তাঁর আনুগত্যের দাবি করেন। নুসরাত সরাসরি আনুগত্য স্বীকার না করে নানাভাবে মুঘল সম্রাটকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাবর নিশ্চেষ্ট না হয়ে বাংলার দিকে অগ্রসর হলেন। এ অবস্থায় নসরৎ-এর পক্ষে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন উপায় রইল না। যুদ্ধে নসরৎ পরাস্ত হন। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বাবরের মৃত্যু হলে পূর্ব ভারতে আফগানরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। নুসরৎ মোগল বিরোধী সংঘকে আবার শক্তিশালী করার জন্য মুঘলদের পরম শত্রু গুজরাটের বাহাদুর শাহের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু উভয় পক্ষের আলাপ আলোচনা চলাকালে আততায়ীর হাতে নসরৎ শাহের মৃত্যু হয়।

নসরৎ শাহের অবদান : 

পিতার মতন নসরৎ শাহ ছিলেন প্রজাহিতৈষী শাসক। তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় মহাভারত এর কিছু অংশ অনুবাদ করার ব্যাপারে সাহায্য করেন। শ্রীকর নন্দী, কবিকঙ্কন প্রমূখ সেযুগের খ্যাতনামা পণ্ডিতরা নসরৎ শাহের অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। 

হুসেন শাহী বংশের অবসান :

নসরৎ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আলাউদ্দিন ফিরোজ সিংহাসনে বসেন। তিনি ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঁকে হত্যা করে তাঁর পিতৃব্য গিয়াসউদ্দিন মামুদ শাহ সিংহাসন দখল করেন। শাসনকার্যে মাহমুদ ছিলেন সম্পূর্ণ অযোগ্য। তিনি বিহারের আফগান দলপতি শেরশাহের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ গৌড় অধিকার করলে মামুদ শাহ পালিয়ে হুমায়ুনের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এইভাবে হুসেন শাহী বংশের অবসান ঘটে। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate