পলাশীর যুদ্ধ

পলাশীর যুদ্ধ, ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩ জুন:
বাণিজ্যিক কারণে সিরাজের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে এসেছিল যার ফলে সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেন। কলকাতায় ইংরেজদের পরাজয়ের সংবাদ মাদ্রাজে পৌঁছায়। সেখানকার ইংরেজ কাউন্সিলের সেনাপতি ওয়াটসন ও কোম্পানির এক সামান্য কর্মচারী রবার্ট ক্লাইভকে একটি নৌবহর নিয়ে কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠান। সিরাজের অনুপস্থিতিতে খুব সহজে ইংরেজরা কলকাতা পুনরুদ্ধার করে। সিরাজ এই সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন কিন্তু কয়েকদিন যুদ্ধ চলার পথ দুই পক্ষের মধ্যে আলিনগরের সন্ধি হয়। এই সন্ধির সমস্ত শর্ত নবাব সিরাজ নতমস্তকে মেনে নিতে বাধ্য হন। এই সন্ধির শর্ত ছিল (১) নবাব সিরাজের বাণিজ্য সুযোগ-সুবিধা স্বীকার করে নেন। (২) নবাব যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হন। (৩) কোম্পানিকে কলকাতা দুর্গ নির্মাণ করার এবং (৪) কোম্পানিকে নিজেদের মুদ্রা চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়।

 কিন্তু নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে শান্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইউরোপের ইঙ্গ-ফরাসিদের সংঘর্ষ বাংলা অব্দি পৌঁছে যায়। নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ইংরেজরা ফরাসিদের চন্দননগর কুঠি আক্রমণ করে দখল করে নেয়। ফরাসিরা মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছে আশ্রয় লাভ করে তখন বাবার ক্লাইভের পক্ষে তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ইংরেজরা উপলব্ধি করেন সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত না করতে পারলে বাংলাদেশ তাদের পক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রাধান্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।
ক্লাইভ ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বুদ্ধিমান সৈনিক। নবাবের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তার কাছে দ্রুত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই সময় সিরাজের প্রতি অসন্তুষ্ট বাংলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি- জগৎশেঠ, সিপাহশালার ও নবাবের আত্মীয় মীরজাফর, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ প্রমুখেরা সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে মীরজাফরকে সিংহাসন অধিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। এই ষড়যন্ত্রে ক্লাইব যোগ দিয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা যখন সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত ছিল। তখন রবার্ট ক্লাইভ সামান্য অজুহাতে ( অর্থাৎ ফরাসিদের মুর্শিদাবাদে আশ্রয় দেওয়ার অজুহাতে) সিরাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। সিরাজ এই সংবাদে অত্যন্ত স্তম্ভিত হন। এই অবস্থায় সিরাজ মীরজাফর, রায়দুর্লভকে সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। মুর্শিদাবাদের ২৩ মাইল দূরে পলাশীর প্রান্তরে উভয়পক্ষের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ বাঁধে। এই যুদ্ধ পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মীরজাফর এবং রায়দুর্লভ যুদ্ধ থেকে দূরে সরে থাকেন কিন্তু নবাবের অন্য দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরমদন, মোহনলাল যুদ্ধ চালিয়ে যান। নবাবের যখন জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে এসেছিল তখন ইংরেজদের গোলার আঘাতে মীরমদনের মৃত্যু হয়। সিরাজ মীরজাফর এর শরণাপন্ন হয়ে তার পরামর্শ কামনা করেন কিন্তু মীরজাফর সিরাজকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন। যুদ্ধ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজের পতন ঘটে। সিরাজ কোনরকমে প্রাণ নিয়ে মুর্শিদাবাদের ফিরে আসেন। ক্লাইভ এর সাহায্যে মীরজাফর মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসেন। সিরাজ মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে যান কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই রাজমহল যাওয়ার পথে সিরাজকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদের নিয়ে আসা হয় এবং নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়। এই সিরাজই ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

 
পলাশীর যুদ্ধের গুরুত্ব :
ইংরেজ কর্তৃত্বের সূচনা :
পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাব এর অবসান ঘটেছিল এবং ইংরেজ কর্তৃত্বে সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এ মত গ্রহণযোগ্য নয় কারণ পলাশীর পরও বাংলার শাসনতান্ত্রিক প্রাধান্য ছিল বাংলার নবাবের হাতে। এই যুদ্ধে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা ছাড়া কোম্পানি অর্থাৎ ইংরেজরা তেমন কিছু লাভ করেনি।
ভারতীয় শক্তির দূর্বলতা :  
বিরাট কিছু পরিবর্তন না আনলেও পলাশীর যুদ্ধের পর এর ফলাফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধে ভারতীয় শক্তির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছিল। এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ভারতীয় রাজন্যবর্গ ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায় চোখে ইংরেজদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি হয়েছিল।
রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি : 
পলাশীর যুদ্ধ বাংলা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল তার কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কোনরূপ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ পলাশী পরবর্তীকালে কোম্পানির প্রভাবমুক্ত থেকে বাংলা শাসন চালানো বাংলা নবাবের পক্ষে সহজ সাধ্য ছিল না। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এই শূন্যতা বাংলার পথে ক্ষতিকর হয়েছিল।
আধুনিক যুগের সূচনা :   
ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে, 'পলাশী যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মধ্যযুগের শেষ হয় আধুনিক যুগের পত্তন হয়েছিল। তিনি আরো লিখেছেন দেশ  ধর্মভিত্তিক শাসনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে আরম্ভ করেছিল। পশ্চিম থেকে নতুন ভাবধারার সঞ্জীবনী স্পর্শে যেন শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, রাজনৈতিক জীবন সর্বত্র আবার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো। ঈশ্বরপ্রেরিত জাদুঘর যেন প্রাচ্যদেশের সমাজের মৃত কঙ্কালগুলিকে জীবন্ত করে তুলল।' অবশ্য এই বক্তব্যকে সর্বাংশে মানা যায় না।
ইংরেজদের অর্থনৈতিক আধিপত্য :
পলাশীর যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল গভীর। এর ফলে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যে ইংরেজদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।  ফরাসিদের বিতাড়ন : 
পলাশীর যুদ্ধের পর দেশীয় ও অপরাপর ইউরোপীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়েছিল। তাই জনৈক ঐতিহাসিক বলেছেন পলাশীর যুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে ভারতে ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। তাদের একসময় বাধ্য হয়ে বাংলা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। 
তাই বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ একেবারে গুরুত্বহীন ছিল একথা বলা যায় না। এই যুদ্ধে ইংরেজদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। অতঃপর বাংলার নবাবী ইংরেজের কৃপার পাত্রে পরিণত হয়েছিল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate