সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধের কারণ

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র কনিষ্ঠ কন্যা আমিনার পুত্র সিরাজদৌল্লা বাংলার মসনদে বসেন। সিরাজদৌল্লা তখন ছিলেন বয়সে নবীন এবং শাসনকার্যে প্রায় অনভিজ্ঞ। স্বাভাবিকভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তির পতনের ফলে রাজনীতির ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণ করার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সিরাজের ছিল না। তাই বিভিন্ন কারণে তরুণ নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধের বেঁধে যায়।
 সিরাজের সাথে ইংরেজদের বিচ্ছেদ ও পরে বিরোধের কথা জানা যায় উভয়ের মধ্যে চিঠিপত্রের মারফত এবং তৎকালীন রেকর্ডবুক থেকে। সিংহাসনে বসার পর থেকেই সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধের সৃষ্টি হয়নি। তবে কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূচনা হয় । 
প্রথমত , প্রথা অনুযায়ী নতুন নবাব যখন নিয়োগ হন তখন যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে নজরানা প্রদান করেননি ফলে স্বাভাবিকভাবে সিরাজ ইংরেজদের প্রতি বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন। 
দ্বিতীয়ত, আলীবর্দী যখন বাংলার নবাব ছিলেন তখন সিরাজ একদিন কাশিমবাজার পুথি পরিদর্শনে গেলে তাকে কাশিমবাজার এর মধ্যে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই ব্যবহারে সিরাজ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। 
তৃতীয়ত, ইউরোপে ইঙ্গ-ফরাসি দের মধ্যে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব এসে পড়ে বাংলার উপর। বাংলায় ইংরেজ এবং ফরাসি উভয়পক্ষ দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। সিরাজ উভয় পক্ষকে দুর্গ নির্মাণে বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। ফরাসিরা সিরাজের কথা মেনে নিলেও ইংরেজরা কিন্তু দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করেনি। এই কারণে সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ বিরোধ শুরু হয়। 
চতুর্থত, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে সিরাজের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মাত্র ঘষেটি বেগম এবং পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকত জঙ্গ। শওকত জঙ্গ ছিলেন আলিবর্দীর দ্বিতীয় কন্যার পুত্র। এবং ঘষেটি বেগম ছিলেন আলিবর্দীর বিধবা কন্যা। সিরাজের সিংহাসন লাভের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘষেটি বেগম এবং শওকত জঙ্গ সিরাজের পতন কামনা করতেন। ইংরেজদের সঙ্গে একসঙ্গে শওকতজঙ্গ এবং ঘষেটি বেগম সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করে। তাই সিরাজ নিজেও আত্মীয়দের থেকে নিজেকে সুরক্ষিত করার জন্য ঘসেটি বেগম কে নজর বন্দী করেন। মুর্শিদাবাদে ঘষেটি বেগমের বিষয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হলে ঢাকায় বেগমের মৃত স্বামী নোয়াজেশ মোহাম্মদের দেওয়ান রাজা রাজবল্লভ ও তার পুত্র কৃষ্ণদাস নওয়াজের ধনসম্পত্তি নিয়ে কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেন। এই ঘটনার ফলে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের সম্পর্ক দ্বিগুণ ভাবে খারাপ হতে থাকে। সিরাজ কলকাতায় গভর্নরকে একটি নির্দেশ পাঠান এবং পলাতক কর্মচারী কৃষ্ণদাসকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ইংরেজরা সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করলে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের সংঘর্ষ বাধে। 
পঞ্চমত, সিরাজের দ্বারা নিযুক্ত গুপ্তচর নারায়ন দাসকে ইংরেজরা কলকাতা থেকে তিরস্কার করে পাঠিয়ে দিলে শিরায় ইংরেজদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। 
ষষ্ঠত, বাণিজ্য সংক্রান্ত ব্যাপারে সিরাজের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধ সৃষ্টি হয়। সিরাজ ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে বিনাশুল্কে ইংরেজ কোম্পানির বাণিজ্যের অধিকার তারা অপব্যবহার করছে এবং কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে ব্যবহার করে স্থানীয় সরকারের ক্ষতি করছে। সিরাজ কঠোর ভাষায় বলেন কোম্পানির দর্শকের অপব্যবহার বন্ধ করবে এবং মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে যে শর্তে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছিল সেই শর্তপালনে যত্নবান হবে। কিন্তু নবাবের এ আদেশ ইংরেজরা মানতে রাজি না হলে সিরাজ ইংরেজদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ক্রমশ উভয়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। 
কিন্তু ব্রিটিশ লেখক হিল রবার্টস প্রমূখ এই কারণগুলোকে যুদ্ধ সৃষ্টির জন্য সিরাজের তৈরি অজুহাত বলে বর্ণনা করেছেন। এদের মতে সিরাজকর্নাটকে ইংরেজদের সাফল্যে ভীত হয়ে মিথ্যা অজুহাতে ইংরেজ কুটি আক্রমণ করে পলাশীর যুদ্ধের পটভূমি রচনা করেন। তারা মনে করেন এই যুদ্ধে ক্ষমতালোভী হিন্দুদের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। উচ্চপদে আসীন সিরাজকে তারা সিংহাসন থেকে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল এবং হিন্দু শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আধুনিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদরা এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেননি এবং একে ইংরেজি লেখকদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধে দুষ্টু কষ্টকল্পনা বলে আখ্যায়িত করেছেন। 
বিরোধের পরিনতি :
বারবার সিরাজের কথা উপেক্ষা অমান্য করলে সিরাজ কঠোরভাবে ইংরেজদের দমন করতে উদ্যোগী হন। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিরাজ প্রথমে কাশিমবাজার কুঠি দখল করেন এবং পরে কলকাতা আক্রমণ করেন। ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের তুমুল যুদ্ধ বাঁধে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে সিরাজের হাতে ইংরেজরা পরাজিত হয়। সিরাজ কলকাতা দখল করেন। এরপর কলকাতার নাম রাখেন আলিনগর। 

অন্ধকূপ হত্যা কতখানি সত্য :
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের বিনা অনুমতিতে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। এই ঘটনায় সিরাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর ক্ষুব্ধ হন। তিনি কোম্পানিকে বার বার পত্রের মাধ্যমে দূর্গ নির্মাণ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। কিনু কোম্পানি অজুহাত দেখায় যে, ফরাসীদের আক্রমণের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাঁরা এই দূর্গ নির্মাণ করছে। পরে ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ ড্রেক নবাবের পত্রের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন নি। সিরাজ প্রথমে গৃহ শত্রুদের মোকাবিলা করতে তৎপর হন তিনি ঘসেটি বেগমকে গৃহবন্দী করে রাখেন। এরপর তিনি শওকত জঙ্গকে শায়েস্তা করার জন্য পুর্ণিয়া যাত্রা করেন। যাত্রাপথে রাজমহলের কাছে তিনি খবর পান ড্রেক তাঁর নির্দেশ অমান্য করে দুর্গ সংস্কারের কাজ পুরোদমে চালাচ্ছেন। তখন সিরাজ পূর্ণিয়া অভিযান স্থগিত রেখে কাশিমবাজারের অভিমুখে যাত্রা করেন। নবাব প্রথমে কাশিমবাজার ইংরেজ কুঠি দখল করেন। এরপর তিনি কলকাতার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। কোম্পানি নবাবের বশ্যতা স্বীকার না করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অতঃপর নবাব ২০ জুন ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ দখল করেন। ড্রেক সিরাজকে বাধাদানের অসমর্থ হন এবং তিনি বেশকিছু কর্মচারী নিয়ে ফলতায় পলায়ন করেন। উল্লেখ্য এখান থেকেই হলওয়েল কাল্পনিক অন্ধকূপ হত্যার কাহিনী রচিত হয়েছে। হলওয়েল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ লেখক এর মতে সিরাজ ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ দখল করার পর ১৮ ফুট × ১৪ ফুট একটি কক্ষে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দী করে রাখেন। এই ১৪৬ জন বন্দীদের মধ্যে ১২৩ জন বন্দী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। হলওয়েল এই বন্দীদের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি কোনোক্রমে বেঁচে যান। এই ঘটনাকে ইতিহাসে অন্ধকূপ হত্যা বা Black Hole Tragedy বলা হয়। এই ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে অনেকের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আধুনিক গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে এই রচনা মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ মনে করেন সিরাজের চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের জন্যই এরকম রচনা করা হয়েছে। কারণ এত ছোট্ট একটি ঘরে কখনো ১৪৬ জনকে বন্দী রাখা সম্ভব ছিল না। এই ঘটনা প্রসঙ্গে অ্যানি বেসান্ত বলেছেন, "জ্যামিতির প্রমাণ অংকের হিসাবকে ভুল প্রমাণ করেছে। " এই আক্রমণের পর নবাব কলকাতার নাম বদলিয়ে রাখেন আলিনগর। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate