পাল ও সেন যুগে বাংলার সংস্কৃতি

 পালযুগ :

ধর্ম: 

পালযুগে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে। পাল রাজারা সাধারণভাবে বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের সময়কালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ ধর্মের একমাত্র আশ্রয়স্থল পরিনত হয়েছিল। তবে পাল রাজাদের অন্যান্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছিল না। এই যুগে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমন্বয় সাধিত হয়েছিল। হিউয়েন সাঙ বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে বহু বৌদ্ধ বিহারের পাশাপাশি বহু হিন্দু মন্দিরও দেখেছিলেন। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমন্বয়ের ফলস্বরূপ পাল যুগের বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পাল যুগে জৈন ধর্মেরও অস্তিত্ব উজ্জ্বল ছিল। 

শিক্ষা :

বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের উদ্দেশ্যে পাল রাজারা বহু বৌদ্ধ মঠ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। মগধে ধর্মপাল বিক্রমশীলা মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি পাঠভবন, ১০৭টি মঠ ছিল এবং এর মাঝখানে ও চারিপাশে ১০৭টি মন্দির ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পাঠগ্রহণ করতেন। দেশ বিদেশ থেকে এই শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন শিক্ষাগ্রহণের জন্য। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য দেশ বিদেশের অনেক বিখ্যাত পন্ডিতও যোগ দিয়েছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য অধ্যাপক ছিলেন শান্তিপদ , অতীশ দীপঙ্কর (শ্রীজ্ঞান), কল্যাণ রক্ষিত প্রমুখ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায়, ব্যাকরণ, জ্যোতিষশাস্ত্র, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে পাঠদান করা হত। প্রায় ৪০০ বছর ধরে বিক্রমশীলা মহাবিহার শিক্ষা চর্চার একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। পাল যুগের অপর একটি বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল বিহারের ওদন্তপুরী বিশ্ববিদ্যালয়। দর্শন চর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ছিল বিস্ময়কর। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮০টি কক্ষ ছিল। পাল যুগের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশ বিদেশের বহু শিক্ষার্থী ও আচার্যগন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। এঁদের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। 



সাহিত্য :

পালযুগে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে সংস্কৃত, প্রাকৃত ও শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষার প্রচলন ছিল। মানুষের কথ্য ভাষা ছিল মাগধী বা অপভ্রংশ । এই মাগধী বা অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষায় উৎপত্তি হয়েছে। পাল যুগের চর্যাপদের মধ্যে প্রাচীন বাংলার নমুনা দেখা যায়। চর্যাপদগুলিতে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের মনের ভাব লোকমুখের ভাষায় ব্যক্ত করেন। সংস্কৃত সাহিত্যে বাংলার মনীষার পরিচয় পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্য, ব্যাকরণ, তর্ক বেদান্ত প্রভৃতি বিষয়ে বাঙালি পণ্ডিতরা খ্যাতি অর্জন করেন। পাল যুগের কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত হলেন চতুর্বেদজ্ঞ দর্ভপাণি, সন্ধ্যাকর নন্দী, জীমূতবাহন প্রমুখ। সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত 'রামচরিত' গ্রন্থে কৈবর্তদের সঙ্গে রামপালের যুদ্ধে বিবরণ সুনিপুণ ভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই যুগের অপর এক বিশিষ্ট পণ্ডিত ছিলেন শ্রীধরভট্ট। দর্শন শাস্ত্রে পন্ডিত শ্রীধরভট্ট রচিত গ্রন্থ ছিল 'ন্যায় - কদলী'। এই গ্রন্থে ন্যায় - বৈশেষিক দর্শনের উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। দেবপালের মন্ত্রী দর্ভপাণি বেদের সুপণ্ডিত ছিলেন। পালযুগে অভিনন্দ নামে এক বাঙালি কবির কথা জানা যায়। তাঁর রচিত কাব্য হল 'কাদম্বরী-কথাসাগর' পালযুগে চিকিৎসা সম্পর্কীয় গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। চরক ও সুশ্রুতের প্রসিদ্ধ টীকাকার চক্রপাণি রচিত 'চিকিৎসা-সংগ্রহ', 'আয়ুর্বেদ-দীপিকা' ছিল উল্লেখযোগ্য। পালযুগে অতীশ দীপঙ্কর ছিলেন বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা পন্ডিত। তিনি তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন। 

সেন যুগ :

ধর্ম :

সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্টপোষক। সেন রাজাদের সময়কালে বৌদ্ধ ধর্ম ক্রমশ নিস্প্রভ হয়ে পড়ে। সেন রাজত্বকালে বিষ্ণু, শিব, পার্বতী প্রভৃতি দেব দেবীর পূজো শুরু হয় এবং বহু মন্দির নির্মিত হয়। তবে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত মন্দির গুলি দেখে ঐতিহাসিকরা মনে করেছেন সেন যুগে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব ছিল খুব বেশি। এই সময়ে শিব পূজারও বিশেষ প্রচলন। সেন রাজাদের অনেক মুদ্রার মধ্যে শিবমূর্তি খোদিত ছিল। তবে শিব, বিষ্ণু ও শক্তি ছাড়া অন্যান্য দেব-দেবীর পূজার প্রচলন ছিল।

বর্ণ-ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা :

আদিতে সেন রাজারা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরে তাঁরা ক্ষত্রিয় হিসেবে পরিচিত হন। সেন যুগে বর্ণভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে। সমাজে ব্রাহ্মণদের স্থান ছিল অনেক উঁচুতে। হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্যদের মধ্যে কৌলীন্য প্রথার প্রচলন হয়। এই কৌলীন্য প্রথার প্রচলন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে রাজা বল্লালসেন কৌলীন্য প্রথার প্রচলন করেন। আবার অনেকের মতে পঞ্চদশ শতকে বাঙালি কুলপঞ্জীকাররাই এই কৌলীন্য প্রথার প্রচলন করেন। কৌলীন্য প্রথা অনুযায়ী কৌলীন্য অর্জনের জন্য নয়টি বিশেষ গুন থাকা আবশ্যক ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণরা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল - কুলীন, শোত্রিয় ও বঙ্গজ। কায়স্থরাও দুই শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল - কুলীন কায়স্থ ও মৌলিক কায়স্থ। সমাজে বিধি নিষেধ ভঙ্গ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। বিধিনিষেধ আরোপ করার সকল ক্ষমতা ছিল ব্রাহ্মণদের হাতে। সমাজে শূদ্রদের তিন ভাগে ভাগ করা হয় - উত্তম সংকর, মধ্যম সংকর ও অধম সংকর। এই সম্প্রদায় ছাড়া আরও কিছু সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল তবে সমাজ ব্যবস্থায় তাদের কোন স্থান ছিল না।

 সাহিত্য :

পাল যুগের মতো সেন যুগেও বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছিল বেশ উন্নত। সেন যুগে সংস্কৃত সাহিত্যের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। এই সময় ছিল সংস্কৃত সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। সেন রাজা বল্লালসেন সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। তিনি দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, এগুলি হল 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' । হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ও দানকর্মের নিয়ম উল্লেখিত হয়েছে এই দুটি গ্রন্থে। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মজীবন নিয়ে অনিরুদ্ধ ভট্ট দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন - 'হরিলতা' এবং 'পিতৃদয়িতা'। লক্ষ্মণসেনের সভাপণ্ডিত হলায়ূধ  'ব্রাহ্মণ-সর্বস্ব', 'মীমাংসা-সর্বস্ব' প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। লক্ষ্মণসেনের অপর সভাপণ্ডিতরা ছিলেন ধোয়ী, উমাপতিধর, ও জয়দেব। ধোয়ী রচনা করেছিলেন বিখ্যাত গ্রন্থ 'পবনদূত'। উমাপতিধর রচনা করেন 'চন্দ্রচূড়-চরিত'। কবি জয়দেব ছিলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের সভাপণ্ডিতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পন্ডিত। জয়দেব রচিত 'গীতগোবিন্দম্' হল বাংলাসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা বিষয়ক জনপ্রিয় কাব্য এটি। এ যুগের একজন শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক ছিলেন পন্ডিত সর্বানন্দ । তাঁর রচিত 'টীকা-সর্বস্ব' একটি সমাদৃত গ্রন্থ। 

শিল্প :

সেন যুগে বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন শূলপাণি। তিনি ছিলেন বরেন্দ্রভূমির খ্যাতনামা শিল্পী। এ যুগের অন্যান্য কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পী হলেন কর্ণভদ্র, তথাগতসার, বিষ্ণুভদ্র প্রমুখ। বাংলার এই শিল্পীগন শাস্ত্রের অনুশাসন মতো মূর্তি ও মন্দির নির্মাণ করতেন। 


আরও পড়ুন : পাল বংশ  ,  সেন বংশ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate