চোল সাম্রাজ্য

 চোলদের পরিচয় : 

চোলরা ছিল দক্ষিণ ভারতের এক অতি প্রাচীন জাতি। অশোকের শিলালিপি, গ্রিক ঐতিহাসিকদের বিবরণে চোলদের উল্লেখ পাওয়া যায়। চোল রাজা হিসেবে কারিকলের নাম পাওয়া যায়। আনুমানিক দ্বিতীয় শতকে কারিকল বর্তমান কালের পেনার ও ভেলার নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে (তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লী, পদুকোটাই প্রভৃতি অঞ্চলে) চোল শাসন শুরু করেন। কিন্তু চের, পল্লব, পাণ্ড্যদের ক্রমাগত আক্রমণের জন্য এক শতকের মধ্যেই চোল রাজ্যের পতন ঘটে। খ্রীষ্টীয় নবম শতক থেকে চোল শক্তির পুনরুত্থান ঘটে। প্রায় তিনশো বছর ধরে চোলরা দক্ষিণ ভারতে আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি ভারতের বাইরে সিংহল, সুমাত্রা, মালয় পর্যন্ত চোলরা রাজ্যবিস্তার করেছিলেন। চোলদের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক সংহতি গড়ে উঠেছিল। এছাড়াও শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল চোলদের নেতৃত্বে। 


রাজা বিজয়ালয় (৮৫০ - ৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ):
খ্রীষ্টীয় নবম শতকে পল্লব বংশের পতন ঘটলে পল্লবদের এক সামন্ত রাজা বিজয়ালয় -এর নেতৃত্বে চোল শক্তির পুনরুত্থান ঘটে। বিজয়ালয় পাণ্ড্যদের হারিয়ে তাঞ্জোর অধিকার করেন এবং তাঁর সময়কাল থেকে চোলদের রাজধানী হয় তাঞ্জোর। 

প্রথম আদিত্য ( ৮৮০ - ৯০৭ খ্রিস্টাব্দ ) :
বিজয়ালয়ের পর তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য চোল সিংহাসনে বসেন। আদিত্য চোল পল্লব-রাজ অপরাজিতকে পরাজিত করে চোল শক্তির স্বাধীনতা ও সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কঙ্গু প্রদেশ জয় করেন এবং গঙ্গদের পরাজিত করেন। তাঁর আমলে চোল রাজ্য উত্তরে মাদ্রাজ থেকে দক্ষিণে কাবেরী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

প্রথম পরান্তক (৯০৭ - ৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ) :
প্রথম আদিত্যের পর চোল রাজা হন তাঁর পুত্র প্রথম পরান্তক। তাঁর আমলে চোল শক্তির প্রকৃত বিস্তার শুরু হয়। তিনি পাণ্ড্য রাজা জয়সিংহকে পরাজিত করে পাণ্ড্য জয় করেন। তিনি নেলোর পর্যন্ত চোল রাজ্যের বিস্তার করেন। চোল শক্তির বিস্তারে আতঙ্কিত হয়ে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ বাণ ও গঙ্গ রাজার সঙ্গে একত্রিত হয়ে চোল রাজ্য আক্রমণ করে। এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য পরান্তক তাঁর পুত্র রাজাদিত্যকে পাঠান। কিন্তু তৃতীয় কৃষ্ণ রাজাদিত্যকে পরাজিত করে নিহত করেন। এরপর প্রথম পরান্তকের মৃত্যু হয়। এরফলে কিছুদিনের জন্য চোল শক্তি দূর্বল হয়ে পড়ে। 

প্রথম রাজরাজ :
সুন্দর চোলের পুত্র প্রথম রাজরাজ -এর নেতৃত্বে ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে চোলরা আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রথম রাজরাজ ছিলেন চোল বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর সামরিক কৃতিত্বের কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায় তাঞ্জোর লিপিতে। তিনি সবার প্রথম ত্রিবান্দ্রমের কাছে চেরদের পরাজিত করেন। এরপর তিনি পাণ্ড্যদের পরাজিত করে মাদুরা দখল করেন এবং পাণ্ড্যরাজ অমরভুজঙ্গকে বন্দী করেন। তিনি চালুক্যদের পরাজিত করে বেঙ্গী দখল করেন। বিশাল নৌবাহিনীর সাহায্যে কেরল আক্রমণ করেন এবং কেরলের রাজা রবিবর্মাকে ত্রিবান্দ্রমের নৌযুদ্ধে পরাজিত করেন। এরপর তিনি ভারতের মূল ভূখণ্ড ছাড়িয়ে সিংহল আক্রমণ করেন। সিংহলের রাজা পঞ্চম মহেন্দ্র প্রথম রাজরাজের বশ্যতা স্বীকার করেন ।এরপর অনুরাধাপুরে চোল অধিকৃত সিংহলের রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি নৌ-অভিযান চালিয়ে লাক্ষাদ্বীপ ও মালদ্বীপ অধিকার করেন। প্রথম রাজরাজ ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঞ্জোরের বিখ্যাত রাজরাজেশ্বর মন্দির তাঁরই কীর্তি। তিনি ৯৮৫ থেকে ১০১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। 


প্রথম রাজেন্দ্র চোল :
প্রথম রাজরাজের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র চোলদের সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন চোল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা। তিনি ১০১৪ থেকে ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তিনি 'গঙ্গাইকোন্ডচোল' ও 'উত্তমচোল' নামে পরিচিত ছিলেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি একাধিক সামরিক অভিযানে সফলতা লাভ করেন এবং চোল শক্তিকে অপ্রতিহত করে তোলেন। বিরাট নৌবাহিনী নিয়ে তিনি সিংহল আক্রমণ করে সিংহলকে চোল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। ১০১৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাণ্ড্য ও চের (কেরল) রাজ্য দুটিকে পরাজিত করে চোলদের অধীনে নিয়ে আসেন এবং নিজের পুত্রকে ঐ রাজ্যগুলির শাসনকর্তা রূপে নিযুক্ত করেন। চালুক্যদের পরাজিত করে তিনি হায়দ্রাবাদে চোলদের আধিপত্য বিস্তার করেন।

 দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের পর রাজেন্দ্র চোল উত্তর ভারত অভিযানে অগ্রসর হন। তিনি কলিঙ্গের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করেন। তিনি পূর্ববঙ্গের শাসক গোবিন্দচন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গের মহীপাল এবং দক্ষিণবঙ্গের রণসূরকে পরাজিত করেন। পূর্ব ভারত জয়লাভ করে তিনি 'গঙ্গাইকোন্ডচোল' (গঙ্গা-বিজেতা চোল) উপাধি ধারণ করেন। শক্তিশালী নৌবাহিনীর সাহায্যে তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং মালব জয় করেন। বাংলাদেশ থেকে ফিরে তিনি কাবেরী নদীর তীরে গঙ্গাইকোন্ড চোলপুরম নামে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। 

রাজেন্দ্র চোলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল  দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সুমাত্রার শৈলেন্দ্র বংশের বিরুদ্ধে নৌ-অভিযান। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে এই অভিযান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার হিন্দু রাজবংশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিল শৈলেন্দ্র বংশ। শৈলেন্দ্র সাম্রাজ্য শ্রীবিজয় নামেও পরিচিত ছিল। শৈলেন্দ্র বংশের রাজা বিজয় তুঙ্গবর্মন রাজেন্দ্র চোলের কাছে পরাজিত হন। এই পরাজয় ফলে শৈলেন্দ্র সাম্রাজ্যের কিছু অংশ চোলদের দখলে আসে। শৈলেন্দ্র রাজ্যের মধ্যে দিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়। এছাড়াও রাজেন্দ্র চোলের তৎপরতায় ব্রহ্মদেশ ও মালয় উপদ্বীপের সঙ্গেও ভারতের যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়। ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু ঘটে। 

পরবর্তী চোল শাসক ও চোল সাম্রাজ্যের পতন :

রাজেন্দ্র চোলের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র প্রথম রাজাধিরাজ (১০৪৪-১০৫২ খ্রিস্টাব্দ) চোল সাম্রাজ্যের রাজা হন। তিনি চের ও পাণ্ড্যদের দমন করতে সক্ষম হন। তিনি সিংহলের বিরুদ্ধেও অভিযান করেন। চোলদের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন বীর রাজেন্দ্র (১০৬৪-১০৭০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি চালুক্যদের আক্রমণ প্রতিহত করে চোল সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করেন। চালুক্যদের বিরুদ্ধে জয়ের স্মৃতিস্বরূপ তিনি তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরবর্তী চোল রাজা ছিলেন কুলোতুঙ্গ (১০৭০-১১২০ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর আমল থেকেই চোল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। চালুক্য সম্রাট ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য তাঁকে পরাজিত করে বেঙ্গী অধিকার করেন। যদিও তাঁর সময়কালে চোলদের সঙ্গে চালুক্যদের সংঘর্ষ কিছুটা কমেছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল তাঁর স্ত্রী ছিলেন একজন চালুক্য রাজকন্যা। অবশ্য পরবর্তী শাসকদের সময়ে চোল ও চালুক্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হয়। তৃতীয় রাজাধিরাজের সময়ে (১২০৬-১২৫৬ খ্রিস্টাব্দ) পাণ্ড্যরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং তাঞ্জোর আক্রমণ করে। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং কাকতীয়, হোয়সলদের ক্রমাগত আক্রমণের আঘাতে চোল রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে।

চোলদের অবদান :

চোলদের অভ্যুত্থান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চোল রাজারা অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। নৌ শক্তিতে চোলরা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। চোল রাজাদের তৎপরতার জন্য নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নৌ-ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা হয় এবং মালয়ের উপকূলে চোলদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়। এমনকি চীন দেশের সঙ্গে বানিজ্যিক সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন ছিল চোলদের শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থায় গ্রামবাসীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। চোলদের শাসনকালে সামন্তদের প্রভাব কমিয়ে এনে কেন্দ্রীয় শাসনকে শক্তিশালী করা হয়েছিল। কৃষকদের উন্নয়নের প্রতি তাঁরা সচেতন ছিলেন। চোল রাজ্যের সরকারি আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমিরাজস্ব। চোলরা শিল্প ও সাহিত্য যথেষ্ট উন্নত ছিল। চোল সাম্রাজ্যে মন্দির-স্থাপত্যকলা উৎকর্ষতা লাভ করেছিল। চোলদের সময়কালে তামিল, তেলেগু ও কানাড়ী ভাষায় বেশকিছু উন্নতমানের সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল। 

চোল শিল্প :

ভারতের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ইতিহাসে চোল রাজাদের অবদান ছিল স্মরণীয়। দক্ষিণ ভারতের শিল্পকলা চরম উৎকর্ষ লাভ করে চোল আমলে। চোল স্থাপত্য রীতিকে দ্রাবিড় রীতি বলা হতো।    পল্লবযুগের মতো পাহাড় খোদাই করে মন্দির তৈরি করা আর হতো না। স্বতন্ত্রভাবে অট্টালিকা নির্মাণ করে মন্দির বানানোর রীতি গড়ে ওঠে। রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোলের আমলে চোল শিল্পের শ্রেষ্ঠ বিকাশ ঘটে। রাজরাজের নির্মিত তাঞ্জোরের রাজরাজেশ্বর শিব মন্দিরটি (১০০৩ --১০১০ খ্রীঃ) ছিল চোল শিল্পকলার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এই মন্দিরটি বিশাল পাহাড়ের মতো। এই মন্দিরের শীর্ষে অবস্থিত গম্বুজটি একটি বিশাল পাথরের খণ্ড। এই বিশালাকার খণ্ডটি কিভাবে মন্দিরের শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, তা যেন আজও বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। রাজেন্দ্র চোল নির্মিত গঙ্গাইকোণ্ড চোলপুরমের (ত্রিচিনপল্লী) বিখ্যাত মন্দিরটি চোল স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অপর একটি অন্যতম নিদর্শন। এই মন্দিরের চূড়া ১৬০ ফুট বা ১০০ হাতের বেশি উঁচু। মন্দিরের গায়ে রয়েছে সুক্ষ্ম কারুকার্যময় অপরূপ ভাস্কর্য। চোল মন্দিরগুলিতে খোদাই করা অসংখ্য মূর্তি অপূর্ব ভাস্কর্যের পরিচয় প্রদান করে। চোল শিল্পকলার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল মন্দিরের প্রবেশের পথে বিশাল তোরণ নির্মাণ। এই তোরনগুলিকে গোপুরম বলা হয়। এই বিশালাকার তোরণগুলি অদ্ভুত বিস্ময় সৃষ্টি করে। চোল আমলে ধাতুশিল্প ছিল যথেষ্ট উন্নত। মন্দিরের বিগ্রহগুলি ধাতু দিয়ে নির্মিত ছিল। তাঞ্জোরের মন্দিরে নির্মিত ব্রোঞ্জের নটরাজ মূর্তি চোল আমলের ধাতুশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। চোল আমলে অনেক গুহামন্দিরও নির্মাণ করা হয়েছিল। অজন্তা ও এলিফ্যান্টার কয়েকটি গুহামন্দির চোল আমলে নির্মিত হয়েছিল। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate