চালুক্য বংশ

ভৌগোলিক দিক থেকে দক্ষিণ ভারতকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় - (১) উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত থেকে দক্ষিণে কৃষ্ণা - তুঙ্গভদ্রা নদী পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় দক্ষিণ ভারত। (২) তুঙ্গভদ্রা নদী থেকে আরও দক্ষিণে কন্যাকুমারী পর্যন্ত অঞ্চলকে সুদূর দক্ষিণ ভারত বলা হয়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে দশম খ্রীস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে সমগ্র দক্ষিণ - ভারতে একাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছিল। এই রাজ্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - দক্ষিণ ভারতের বকাটক, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট এবং সুদূর দক্ষিণ ভারতের পাণ্ড্য, চোল ও পল্লব।

বাতাপির চালুক্যবংশ :

প্রথম ষষ্ঠ শতক থেকে অষ্টম শতক  এবং পরবর্তীতে দশম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের বা দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চালুক্যরা প্রথম উত্তর কর্ণাটকের বাতাপি অঞ্চল ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে রাজ্য গড়ে তোলে। এরপর তারা বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। চালুক্যদের চারটি শাখার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন - (১) বাতাপির চালুক্যবংশ বা পশ্চিমী চালুক্যবংশ, (২) বেঙ্গীর চালুক্যবংশ, (৩) কল্যানের চালুক্যবংশ, (৪) গুজরাটের চালুক্যবংশ। 


চালুক্যদের পরিচয় :
চালুক্যদের আদি পরিচয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ আছে। ডি. সি. সরকার, আর. এস. শর্মা প্রমুখেরা মনে করেন চালুক্যরা প্রাচীন কানাড়ী বংশোদ্ভূত। ভি. স্মিথ এর মতে চালুক্যরা ছিল গুর্জর বংশোদ্ভূত এবং কোন এক সময় এরা দাক্ষিণাত্যে এসে বসবাস করতে থাকে। বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতে  প্রথম চালুক্য রাজা বিজয়াদিত্যের পূর্বপুরুষগণ দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশে বসবাস করতেন এবং কৃষ্ণা উপত্যকায় হিরণ্যরাষ্ট্র অঞ্চলটি ছিল বিজয়াদিত্যের বাসভূমি। 


প্রথম পুলকেশী :
প্রথম পুলকেশীর রাজত্বকালে চালুক্য শক্তির বিস্তার ঘটে। তিনি ৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে বিজাপুরের অন্তর্গত বাতাপি অঞ্চলে সর্বপ্রথম স্বাধীনভাবে রাজত্ব শুরু করেন। তাঁর রাজধানী ছিল ছিল বাতাপি নগর। তিনি ৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। 


কীর্তিবর্মন :
প্রথম পুলকেশীর পর চালুক্য বংশের রাজা হন কীর্তিবর্মন। তিনি নল, মৌর্য ও কদম্ব শক্তিকে পরাজিত করেন। কীর্তিবর্মন ৫৬৬ থেকে ৫৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। 


মঙ্গলেশ :
কীর্তিবর্মনের পর চালুক্য সিংহাসনে বসেন মঙ্গলেশ। তিনি কলচুরি শক্তিকে পরাজিত করেন এবং রত্নগিরি দখল করেন। তিনি বাতাপির বিখ্যাত বিষ্ণুমন্দির নির্মাণ করেন। 


দ্বিতীয় পুলকেশী :
চালুক্যরাজা মঙ্গলেশকে গৃহযুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিতীয় পুলকেশী সিংহাসন অধিকার করেন (৬১০ খ্রিস্টাব্দে)। সিংহাসন লাভ করার পর কয়েকবছর অভ্যন্তরীণ অরাজকতা দমন করতে উদ্যোগী হন। অভ্যন্তরীণ অরাজকতা দমন করে তিনি রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি ছিলেন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী। রবিকীর্তি রচিত 'আইহোল প্রশস্তি' থেকে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের কথা জানা যায়। তিনি কদম্ব ও মহীশূরের গঙ্গ রাজ্যের রাজাদের পরাজিত করেন। তিনি উত্তর কঙ্কনের মৌর্যদের পরাজিত করেন এবং তাদের রাজধানী অধিকার করেন। মালব ও গুজরাটের রাজারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেন। পল্লব রাজা মহেন্দ্রবর্মণও দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে পরাজিত হন। তিনি হর্ষবর্ধন'কে পরাজিত করে হর্ষবর্ধনের দক্ষিণ ভারত অভিযান ব্যর্থ করেন। দক্ষিণে অবস্থিত চোল, কেরল ও পাণ্ড্য রাজ্যের রাজারা দ্বিতীয় পুলকেশীর বশ্যতা স্বীকার করেন। এই ভাবে দ্বিতীয় পুলকেশী দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন।

দ্বিতীয় পুলকেশীর প্রভাব - প্রতিপত্তি বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে পল্লব-রাজ নরসিংহবর্মণের নেতৃত্বে পল্লবরা পুলকেশীর রাজধানী বাদামি আক্রমণ করেন। পুলকেশী ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হন এবং অবশেষে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে চালুক্য সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। 



কল্যানের চালুক্যবংশ :

কল্যানের চালুক্যবংশের প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় তৈল বা তৈলপ নামে রাষ্ট্রকূটদের এক সামন্ত। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রকূট বংশের শেষ রাজা চতুর্থ অমোঘবর্ষকে পরাজিত করে তৈলপ চালুক্য বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। হায়দ্রাবাদ রাজ্যের অন্তর্গত কল্যাণ বা কল্যাণী ছিল চালুক্য বংশের রাজধানী। তৈলপ পশ্চিমী চালুক্যবংশের কিছু রাজ্য পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি উড়িষ্যা,নেপাল ও কুন্তল প্রভৃতি রাজ্য জয়লাভ করেন। তিনি ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এই বংশের পরবর্তী রাজা ছিলেন সত্যাশ্রয়। এরপর সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় জয়সিংহ। এর পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন প্রথম সোমেশ্বর। তিনি কোপ্পামের যুদ্ধে চোলদের কাছে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের অপমানে কুরুবতী নামক স্থানে তুঙ্গভদ্রা নদীতে প্রাণ বিসর্জন দেন। প্রথম সোমেশ্বরের পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় সোমেশ্বর। সত্যাশ্রয়,দ্বিতীয় জয়সিংহ, প্রথম সোমেশ্বর ও দ্বিতীয় সোমেশ্বর এরা যথাক্রমে ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য : 

দ্বিতীয় সোমেশ্বরের ভ্রাতা বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অধীকারের বিরোধিতা করেন। চোল রাজা বীর রাজেন্দ্র চালুক্য সাম্রাজ্য আক্রমণ করলে তার সুযোগ নিয়ে তিনি কল্যানের চালুক্য রাজ্যের বিচ্ছেদ করেন। বিক্রমাদিত্য কল্যানের চালুক্য রাজ্যের দক্ষিণ অংশ পান এবং ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য উপাধি নিয়ে শাসনকাজ শুরু করেন। তিনি চোল রাজা বীর রাজেন্দ্রের কন্যাকে বিবাহ করে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেন। এই বিবাহের ফলে সাময়িক ভাবে চোল - চালুক্য দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। 

চালুক্যরাজ বীর রাজেন্দ্রের মৃত্যুর পর পুনরায় চোল - চালুক্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। চোল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন প্রথম কুলোতুঙ্গ। তিনি কল্যানের চালুক্য রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বিরোধিতা করেন , অন্যদিকে বিক্রমাদিত্যের ভ্রাতা সোমেশ্বরও  তাঁর বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত সোমেশ্বর ও কুলোতুঙ্গ জোটবদ্ধ হয়ে বিক্রমাদিত্যের বিরোধিতা করেন। কোলারের যুদ্ধে বিক্রমাদিত্য কুলোতুঙ্গের হাতে পরাজিত হয়ে তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে বিতাড়িত হন। কিন্তু সোমেশ্বর বিক্রমাদিত্যের হাতে বন্দী হন। বিক্রমাদিত্য সোমেশ্বরের রাজ্য অধিকার করেন এবং ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে সম্পূর্ণ কল্যানের চালুক্য সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেন। তিনি ছিলেন কল্যানের চালুক্যবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। এই বিজয়ের পর তিনি 'চালুক্য বিক্রমকাল' চালু করেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে কুলোতুঙ্গের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি গঠনমূলক কাজে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর রাজসভায় কবি ও বিদ্বান ব্যক্তিদের উপস্থিতি ছিল। তাঁর সভাকবি বিলহন রচনা 'বিক্রমাঙ্কদেবচরিত' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যা থেকে বিক্রমাদিত্যের সামরিক প্রতিভা ও রাজ্য জয়ের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানেশ্বর নামক এক পন্ডিতও তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। 

বিক্রমাদিত্য তাঁর রাজত্বকালের শেষ দিকে পুনরায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। হোয়সলরাজ বিষ্ণুবর্ধন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিক্রমাদিত্য যুদ্ধে বিষ্ণুবর্ধনকে পরাজিত করেন এবং মহীশূরের কিছু অংশ দখল করে নেন। এরপর চোলরাজ কুলোতুঙ্গকে পরাজিত করে বেঙ্গীতে চালুক্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। 

ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের পর চালুক্যদের পতন আরম্ভ হয়। এই বংশের শেষ রাজা চতুর্থ সোমেশ্বর কিছু দিন রাজত্ব করেন। ১১৯০ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের যাদব ও হোয়সলদের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে কল্যানের চালুক্যবংশ দূর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত যাদব ও হোয়সলরা চালুক্য সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate