মগধের উত্থান

খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ১৬ টি জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মগধ রাজ্য একছত্র প্রাধান্য লাভ করে। মগধ বাকী রাজ্য গুলিকে পরাজিত করে এক বৃহৎ সাম্রাজ্য গঠন করে। ঐতিহাসিক ডক্টর হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী মগধ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাকে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্যের স্থাপনা বলে অভিহিত করেছেন।  
মগধের উত্থানের কারণ :
মগধের উত্থান ভারতের ইতিহাসে কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। এই উত্থানের পিছনে কতকগুলি কারণ ছিল। 
১) ভৌগোলিক পরিবেশ 
সমকালীন ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় মগধের অবস্থান ছিল এর উত্থানের পক্ষে সহায়ক। গঙ্গা, শোন ও চম্পা এই তিনটি নদী দ্বারা মগধ তিন দিক থেকে সুরক্ষিত ছিল। মগধের প্রথম রাজধানী রাজগৃহ ছিল পাঁচটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত এবং সুরক্ষিত।
২) কৃষিকাজ
নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় মগধে কৃষিকাজ ছিল উন্নত। কৃষি জমি উর্বর হওয়ার কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন হত। মগধের অধিকাংশ জমিতে বছরে দুবার ফসল ফলানো যেত। এজন্যই মগধ রাজ্য আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল ছিল। 
৩) খনিজ ভাণ্ডার
উর্বর কৃষি জমি ছাড়াও মগধের আর্থিক স্বচ্ছলতার অন্য একটি কারণ ছিল খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য। সে সময় মগধের ধলভূম ও সিংভূম অঞ্চল ছিল লোহা ও তামার খনিতে সমৃদ্ধ। এই লোহার দ্বারা কৃষি যন্ত্রপাতি ও যুদ্ধের অস্ত্র তৈরি করা হত। 
৪) বানিজ্য
কৃষি ও খনিজ সম্পদে উন্নতির পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যেও মগধ ছিল উন্নত। গঙ্গা, শোন, চম্পা প্রভৃতি নদীর মাধ্যমে খুব সহজেই জলপথে ব্যবসা বাণিজ্য চলত। 
৫) যোগ্য শাসক
মগধের সিংহাসনে একাধিক যোগ্য শাসকদের আবির্ভাব মগধের উত্থানকে সম্ভব করেছিল। মগধের নৃপতিদের মধ্যে বিম্বিসার, অজাতশত্রু, মহাপদ্মনন্দ এবং পরবর্তীতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও অশোকের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, দূরদৃষ্টিতা, কূটনৈতিক দক্ষতা ছিল মগধের উত্থান ও সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। 
মগধের উত্থান :
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে ১৬ টি মহাজনপদ -এর উল্লেখ পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে কোশল, অবন্তী, বৎস ও মগধ সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভারতে একছত্র প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে চারটি রাজ্য পরস্পরের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। অবশেষে বাকী রাজ্যগুলিকে পরাজিত করে মগধ আর্যাবর্তে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্জন করে এবং এক সুবৃহৎ সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচনা করে। মগধে চারটি রাজবংশ রাজত্ব করে, এরা হল - হর্যঙ্ক বংশ, শৈশুনাগ বংশ, নন্দ বংশ এবং মৌর্য বংশ। 
(১) হর্যঙ্ক বংশ 
বিম্বিসার 
বিম্বিসারের রাজত্বকালেই মগধের সাম্রাজ্য বিস্তারের সূচনা ঘটেছিল। বিম্বিসার ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৪৯৮ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল রাজগৃহ। তিনি রাজ্য বিস্তারের জন্য দু'প্রকার নীতি অনুসরণ করতেন, যথা - যুদ্ধের দ্বারা বলপূর্বক রাজ্যবিস্তার এবং বিবাহ সম্পর্ক দ্বারা ক্ষমতা বিস্তার। তিনি অঙ্গরাজ্যের রাজা ব্রহ্মদত্তকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্য অধিকার করেন। তিনি কোশলরাজ প্রসেনজিতের ভগিনী কোশল দেবীকে বিবাহ করেন এবং যৌতুক হিসেবে কাশী রাজ্যের কিছু অংশ লাভ করেন। তিনি বৈশালীর লিচ্ছবি রাজকন্যা চেল্লনাকে বিবাহ করে গঙ্গার উত্তরতীর থেকে তরাই অঞ্চল পর্যন্ত মগধের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।  এছাড়া, বিদেহ রাজকন্যা বাসবীকে এবং মদ্র রজকন্যা  ক্ষেমাকে বিবাহ করে মগধের ক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আনুমানিক ৪৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি নিজপুত্র অজাতশত্রুর হাতে নিহত হন। 
অজাতশত্রু
বিম্বিসারের পর পুত্র অজাতশত্রু সিংহাসনে বসে পিতার মতই রাজ্য - বিস্তার নীতি অনুসরণ করেন। তিনি ছিলেন সুদক্ষ যোদ্ধা। অজাতশত্রু নিজ পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করলে মর্মাহত কোশলদেবী প্রাণত্যাগ করেন। এই ঘটনার ফলে কোশলদেবীর ভাই কোশলরাজ প্রসেনজিত কাশী পুনর্দখল করেন। এতে অজাতশত্রুর সাথে তাঁর বিরোধ বাধে। এরপর কোশলরাজ প্রসেনজিতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলার পর প্রসেনজিত পরাস্ত হন এবং নিজ কন্যার সঙ্গে অজাতশত্রুর বিবাহ দিয়ে এবং কাশী রাজ্য যৌতুক হিসেবে দান করে মিত্রতা স্থাপন করেন। এই ভাবে অজাতশত্রু স্থায়ীভাবে কাশী রাজ্য লাভ করেন। এরপর মগধের সঙ্গে বৈশালীর লিচ্ছবি রাজ্যের যুদ্ধ আরম্ভ হয়। গঙ্গা নদী ও তার উপত্যকার ওপর আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এই যুদ্ধ বাধে। এই যুদ্ধে লিচ্ছবির পক্ষে ৩৬ টি গণরাজ্য যোগ দেয়। কিন্তু অজাতশত্রুর কূটনৈতিক কৌশলে গণরাজ্যগুলির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। প্রায় ১৬ বছর যুদ্ধের পর অজাতশত্রু গণরাজ্যগুলিকে পরাজিত করে মগধের অধীনে আনেন। এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে গঙ্গার উভয় কূল মগধের অধীনে আসে। সমগ্র বিহার ও বৈশালী মগধের অধীনস্থ হয়। 
অজাতশত্রুর পর তাঁর পুত্র উদয়ভদ্র বা উদয়িন সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন অজাতশত্রুর পর হর্যঙ্ক বংশের একমাত্র রাজা। তাঁর সময়কালে মগধের নতুন রাজধানী হয় গঙ্গা ও শোন নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত পাটলিপুত্র। 
(২) শৈশুনাগ বংশ
হর্যঙ্ক বংশের শেষ রাজা নাগদাসকে হত্যা করে মন্ত্রী শিশুনাগ মগধের সিংহাসনে বসেন। এইভাবে শৈশুনাগ বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। শিশুনাগ সিংহাসনে বসেই অবন্তী রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং জয়লাভ করে অবন্তীকে মগধের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি মগধের রাজধানী রাজগৃহ থেকে বৈশালীতে স্থানান্তরিত করেন। শিশুনাগের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী ছিলেন কাকাবর্ণ বা কালাশোক। তিনি মগধের সিংহাসনে বসার পর পাটলিপুত্রে পাকাপাকিভাবে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। 
(৩) নন্দ বংশ
মহাপদ্মনন্দ
কালাশোকের উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতার সুযোগ নিয়ে মহাপদ্মনন্দ নামে এক শূদ্রবংশীয় বীর কালাশোক এবং তাঁর বংশধরদের নিহত করে ৩৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মগধের সিংহাসনে বসেন। পুরাণে মহাপদ্মনন্দকে 'সর্বক্ষত্রান্তক' ও 'একরাট' (সম্রাট) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বহু ক্ষত্রিয় রাজবংশের উচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন। তিনি ইক্ষবাকু, পাঞ্চাল, অস্মক, কুরু, মিথিলা প্রভৃতি ক্ষত্রিয় রাজ্য দখল করেছিলেন। তিনি কোশল রাজ্যটিও দখল করেন। তাঁর সময়কালে পশ্চিমে পাঞ্জাব, দক্ষিণে বোম্বাই ও মহীশূর এবং কলিঙ্গ মগধের অন্তর্ভুক্ত করেন। 

ধননন্দ
মহাপদ্মনন্দের মৃত্যুর পর আরও আটজন মগধের সিংহাসনে বসেন। তাঁদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। নন্দ বংশের শেষ রাজা ছিলেন ধননন্দ। গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ঐ সময়ে ভারত অভিযানে আসেন। গ্রীক লেখকদের রচনা থেকে তাঁর অতুল শক্তি, সেনাবাহিনী ও সম্পদের কথা জানা যায়। ধননন্দ অত্যাচারী রাজা ছিলেন। বিশাল সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রজাদের করের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন। কর আদায় করার জন্য ব্যাপক অত্যাচার শুরু করেন। ফলে প্রজাদের মনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ বংশের উচ্ছেদ করে মগধে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। 
(৪) মৌর্য বংশ
চন্দ্রগুপ্তের বংশপরিচয় সম্পর্কে পুরানের টিকাকাররা বলেছেন যে, তিনি ছিলেন নন্দ রাজার শূদ্রা উপপত্নী মুরার পুত্র। তবে বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্য থেকে এই মতের সমর্থন মেলে না। বৌদ্ধ সাহিত্য অনুসারে মৌরিয় বা মৌর্য বংশ ছিল পিপ্পলীবনের একটি ক্ষত্রিয় গোষ্ঠী। চন্দ্রগুপ্ত এই ক্ষত্রিয় বংশের সন্তান ছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের পিতা ধননন্দের দ্বারা নিহত হন। ব্রাহ্মণ চাণক্য বালক চন্দ্রগুপ্তকে শিক্ষা ও অস্ত্র বদ্যায় পারদর্শী করে তুলেছিলেন। এই চাণক্যের সহায়তায় ক্ষত্রিয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ধননন্দকে যুদ্ধে পরাজিত করে নন্দ বংশের উচ্ছেদ ঘটিয়ে এবং মগধে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate