হরপ্পা সভ্যতা

ভূমিকা:
সাধারণ ভাবে মনে করা হতো, আর্যদের আসার পর ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সূচনা ঘটে। কিন্তু বিংশশতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে সিন্ধু নদের উপত্যকায় এক প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে পূর্ববর্তী ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। সিন্ধু নদের তীরে করাচি থেকে ২০০ মাইল উত্তরে মহেঞ্জোদারো এবং আরও উত্তরে বর্তমান লাহোর থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরাবতী নদীর ধারে হরপ্পায় এই প্রাচীন সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেছে। এই প্রাচীন সভ্যতার নাম হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতা বা দ্রাবিড় সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতার স্থান :
ভারতের উত্তরপশ্চিমে সিন্ধুপ্রদেশের লাড়কানার জেলার মহেঞ্জোদাড়ো এবং পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলার হরপ্পা নামে দুটি জায়গা।

এই সভ্যতার সময়কাল - ৩০০০ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে ১৫০০ খ্রীষ্টপূর্ব। 
হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার ও আবিষ্কর্তা:
সাল - ১৯২১   থেকে   ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। 
আবিষ্কর্তা -  রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ও দয়ারাম সাহানি। 
* কিছুকাল আগে পর্যন্ত হরপ্পা সভ্যতা সম্পর্কে কোন পরিচয় ছিল না। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক কানিংহাম ইরাবতী নদীর তীরে হরপ্পায় একটি সীলমোহরের সন্ধান পান। সেই সিলমোহরে অপরিচিত লিপি খোদাই করা ছিল । পরবর্তী কালে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধু প্রদেশের লাড়কানা জেলার অন্তর্গত মহেঞ্জোদাড়োতে (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত) একটি বিশাল ধ্বংসস্তূপের সন্ধান পান। এই ধ্বংসস্তূপের ভিতরে কিছু সীলমোহর ও কিছু পাথরের হাতিয়ার পাওয়া যায়। ঐ বছর অপর এক প্রত্নতাত্ত্বিক দয়ারাম সাহানি এরকমই ধ্বংসস্তূপের সন্ধান পান হরপ্পায়। 
হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য:
* নগর পরিকল্পনা:
হরপ্পায় পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ছিল । শহরের অধিকাংশ বাড়ি ছিল পোড়া ইট দিয়ে তৈরি। প্রতিটি বাড়িতে স্নানাগার ও পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল। নগরের মাঝবরাবর ছিল প্রশস্ত রাজপথ। রাজপথের পাশে নর্দমা ছিল ঢাকা। 
* স্নানাগার, দূর্গ, শস্যাগার:
মহেঞ্জোদাড়োতে ৩৯ ফুট লম্বা, ২৩ ফুট চওড়া ও ৮ ফুট গভীরতা বিশিষ্ট একটি বৃহৎ স্নানাগার আবিষ্কৃত হয়েছে। 

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর নিরাপত্তার জন্য বড়ো বড়ো দূর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। হরপ্পার দূর্গটির দেওয়াল ছিল ১৩ মিটার উঁচু। নগর দুটিতে শস্য মজুত রাখার বড়ো শস্য ভান্ডারে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। 
* শাসন ব্যবস্থা:
শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পাওয়া গেলেও শহরের বিন্যাস দেখে অনুমান করা হয় সেখানে পৌর ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। একই ধরনের প্রাসাদ নির্মাণ, পরিমাপ দেখে বোঝা যায় সেই অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। 
হরপ্পার সভ্যতার অর্থনৈতিক জীবন:
* জীবিকা:
এখানকার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। মাছ-মাংস, গম-বার্লি, ধান ছিল তাদের প্রধান খাদ্য। শিব-দুর্গা, গাছ, পশু ও সাপ ছিল তাদের উপাস্য দেবতা। অধিবাসীদের মধ্যে শবদাহ ও কবর দেওয়া উভয় রীতির প্রচলন ছিল। বাঘ, ভাল্লুক প্রভৃতি  বন্য জন্তুর উল্লেখ পাওয়া গেলেও ঘোড়ার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। 
* ধাতু শিল্প ও মৃৎশিল্প:
এখানকার অধিবাসীরা সোনা,রূপা,টিন,তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার জানত। তবে লোহার ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। সোনা, রূপা দিয়ে নানা ধরনের অলঙ্কার তৈরী করত। মৃৎশিল্পীরা পলিমাটি, বালি ও চুনের গুঁড়ো মিশিয়ে কলসি, থালা তৈরি করত। চীনামাটির পাত্র তৈরিতে তারা দক্ষ ছিল। কুঠার, তরবারি, তীর ,ধনুক প্রভৃতি এখানে পাওয়া গেছে। এছাড়া জীবজন্তুর ছবি আঁকা শীলমোহরও পাওয়া গেছে। 
* বানিজ্য:
সিন্ধুবাসীরা ব্যবসা বাণিজ্যে যথেষ্ট দক্ষ ছিল। চাকার গাড়ি নৌকার সাহায্যে দেশে ও ভারতের বাইরে মধ্য- এশিয়া ও পশ্চিম- এশিয়ার সাথে হরপ্পার বানিজ্য চলত। মেসোপটেমিয়া, সুমেরীয়, মিশরের সাথে বাণিজ্য চলত। রপ্তানি দ্রব্য ছিল ময়ূর, হাতির দাঁতের তৈরি নানা সামগ্রী এবং আমদানি করা দ্রব্য ছিল রূপা, নীলকান্তমণি প্রভৃতি। 

আরও পড়ুন : আর্য সভ্যতা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Translate